সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০

ধ্বনির রূপান্তর

 

                     ধ্বনির রূপান্তর:
শব্দের মধ্যে কখনো কখনো ধ্বনির আগমন এবং ধ্বনির লোপের ফলে শব্দের মধ্যে পাশাপাশি থাকা কোন একটি ধ্বনি বদলে যায় একেই বলা হয় ধ্বনির রূপান্তর।
বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি উভয়ের রূপান্তর দেখা যায়।
স্বরধ্বনির রূপান্তর:

১) স্বরসঙ্গতি:
যখন শব্দের মধ্যে একাধিক স্বরধ্বনি থাকে তখন একটি স্বরধ্বনির প্রভাবে আরেকটি স্বরধ্বনি যখন বদলে যায় বা উভয় স্বরধ্বনির প্রভাবে উভয়েই বদলে যায় এবং একটি ধ্বনি সাম্য লাভ করে অর্থাৎ একাধিক স্বরের মধ্যে সংগতি হয় তখন তাকে স্বরসঙ্গতি বলা হয়।
যেমন: সুপারি> সুপুরি, বিলাতি >বিলিতি, মিথ্যা> মিথ্যে, হিসাব> হিসেব।



স্বরসঙ্গতি কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়
প্রগত স্বরসঙ্গতি
পরাগত স্বরসঙ্গতি এবং
অনোন্য বা পারস্পরিক স্বরসঙ্গতি

ক) প্রগত স্বরসঙ্গতি:
যখন পূর্ববর্তী স্বরের প্রভাবে পরবর্তী স্বর বদলে যায় তখন তাকে প্রগত স্বরসঙ্গতি বলা হয়।
যেমন: সুপারি >সুপুরি, মিথ্যা >মিথ্যে, পূজা> পুজো।

খ) পরাগত স্বরসঙ্গতি:
পরবর্তী স্বরধ্বনির প্রভাবে যখন পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি বদলে যায় তখন তাকে বলা হয় পরাগত স্বরসঙ্গতি।
যেমন: দেশি> দিশি, লিখা> লেখা ,উঠা >ওঠা।

গ) অনন্য বা পারস্পরিক স্বরসঙ্গতি:
শব্দের মধ্যে যখন স্বরধ্বনি গুলি একটি অন্যটির প্রভাবে অর্থাৎ উভয় উভয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় তখন তাকে বলা হয় অনন্য বা পারস্পরিক স্বরসঙ্গতি।
যেমন: যোগ্য >যুগ‍্যি, শেফালী>শিউলি,পোষ্য> পুষ‍্যি।

অভিশ্রুতি: শব্দের মধ্যে ই বা উ যেখানে থাকে তার আগেই উচ্চারণ করার একটা প্রবণতা বাংলা ভাষায় দেখা যায় ।বাংলা ভাষায় একে বলা হয় অপিনিহিতি। এই অপিনিহিতি জাতীয় ই বা উ যখন পাশাপাশি থাকা কোন স্বরধ্বনি কে প্রভাবিত করে এবং নিজেরাও তার সঙ্গে মিশে গিয়ে পরিবর্তিত হয়ে যায় তখন তাকে বলা হয় অভিশ্রুতি।
যেমন: বলিয়া> বইল‍্যা>বলে ,আসিয়া>আইস‍্যা> এসে, করিয়া>কইর‍্যা>করে।

              ব্যঞ্জন ধ্বনির রূপান্তর:

১) সমীভবন: শব্দের মধ্যে দুটি অসম ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি অবস্থান করলে, উচ্চারণ করার সময় তাদের মধ্যে সমতা আনার জন্য বা সহজ করে উচ্চারণ করার জন্য, দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি কে একটি বর্গের ধ্বনির মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয় বা সমতা বা সাম্য আনার চেষ্টা করা হয়। একে বলা হয় সমীভবন।
উদাহরণ: পদ্ম> পদ্দ, সৎ+ জন> সজ্জন।

সমীভবন কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়-
ক) প্রগত সমীভবন
খ) পরাগত সমীভবন
গ) অনন্য সমীভবন

ক) প্রগত সমীভবন: পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির প্রভাবে যখন পরবর্তী ব্যঞ্জনধ্বনি রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তাকে বলা হয় প্রগত সমীভবন।
উদাহরণ: পদ্ম>  পদ্দ, চন্দন>  চন্নন, চক্র>  চক্ক।

খ) পরাগত সমীভবন  পরবর্তী ব্যঞ্জনধ্বনির প্রভাবে যখন পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনি টি রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তাকে বলা হয় পরাগত সমীভবন।
উদাহরণ: গল্প > গপ্প, পোত্দার>  পোদ্দার,  কর্ম>  কম্ম।

গ) অনন্য সমীভবন: যখন পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি পরস্পর পরস্পরের প্রভাবে রূপান্তরিত হয়ে যায় তখন তাকে অনন্য সমীভবন বলা হয়।
উদাহরণ: উৎ+ শ্বাস> উচ্ছাস,কুৎসা> কেচ্ছা, বৎসর> বচ্ছর।

বিষমীভবন: সমীভবনের বিপরীত প্রক্রিয়া হল বিষমীভবন। শব্দের মধ্যে যদি একই রকম ব্যঞ্জনধ্বনি থাকে তাহলে কোন একটি পাল্টে গেলে তাকে বলা হয় বিষমীভবন।
উদাহরণ: লাল> নাল, শরীর> শরীল।

ঘোষীভবন: অঘোষ ধ্বনি যখন ঘোষ ধ্বনি তে রূপান্তরিত হয় তখন তাকে ঘোষীভবন বলে।
উদাহরণ: কতদূর >কদ্দূর, ছোটদা> ছোড়দা।

অঘোষী ভবন: ঘোষ ধ্বনি যখন অঘোষ ধ্বনি তে রূপান্তরিত হয় তখন তাকে অঘোষ ভবন বলা হয়।
উদাহরণ: বড়ঠাকুর> বট্ ঠাকুর, ছাদ> ছাত্, বাবু> বাপু।
মহাপ্রাণী ভবন: অল্পপ্রাণ ধ্বনি যখন মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি তে রূপান্তরিত হয় তখন তাকে মহা প্রাণী ভবন বলা হয়।
উদাহরণ: কাঁটাল >কাঁঠাল, স্তম্ভ >থাম।

অল্পপ্রাণী ভবন: মহা প্রাণী ভবন এর বিপরীত প্রক্রিয়া হল অল্প প্রাণী ভবন । মহাপ্রাণ ধ্বনি যখন অল্পপ্রাণ ধ্বনি তে রূপান্তরিত হয় তখন তাকে অল্প প্রাণী ভবন বলা হয়। একে ক্ষীণায়ন ও বলা হয়।
উদাহরণ: বাঘ >বাগ, দুধ >দুদ, শৃংখল> শেকল।

নাসিক্যীভবন: তৎসম শব্দের মধ‍্যে কখনো কখনো নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পায় ফলে শব্দ মধ্যস্থ স্বরধ্বনি অনুনাসিক হয়ে যায়, এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নাসিক্যীভবন।
উদাহরণ: দন্ত >দাঁত, চন্দ্র >চাঁদ, হংস> হাঁস।

স্বতোনাসিক্যীভবন: স্বরধ্বনি যখন নাসিক্য ধ্বনির প্রভাব ছাড়া অনুনাসিক হয়ে যায় তখন তাকে স্বতোনাসিক্যীভবন বলা হয়।
উদাহরণ: হাসপাতাল> হাঁসপাতাল, পেচক> পেঁচা।

মূর্ধন্যীভবন:  মূর্ধন‍্য ধ্বনি এর প্রভাবে দন্ত্য ধ্বনি যখন মূর্ধন্য ধ্বনি তে রূপান্তরিত হয় তখন তাকে মূর্ধ্যন্যীভবন বলা হয়।
উদাহরণ: পতঙ্গ> ফড়িং, বালতি >বালটি।

র কারীভবন: স ধ্বনি যখন প্রথমে জ এবং পরে র ধ্বনিতে পরিণত হয় তখন তাকে বলা হয় র কারীভবন।
উদাহরণ: দ্বাদশ> বারো, পঞ্চদশ >পনেরো।

সংকোচন: আমরা যখন সহজ ভাবে উচ্চারণ করি অর্থাৎ উচ্চারণের কষ্ট লাঘব করার জন্য শব্দের মধ্যে কতকগুলি  ধ্বনিকে স্পষ্টরূপে উচ্চারণ না করে যদি একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ধ্বনি উচ্চারণ করি তবে তাকে বলা হয় সংকোচন।
উদাহরণ: বৈবাহিক> বেয়াই >ব‍্যাই ,যাহা ইচ্ছা তাই >যাচ্ছেতাই।




  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন